• Jayanti Riverview

চেনা অচেনা বক্সা জয়ন্তী (প্রথম অধ্যায়)

Updated: Aug 6, 2020

পদব্রজে উত্তরবঙ্গ থেকে ভূটান


|| প্রথম পর্ব ||


বাংলা প্রবাদ আছে উঠল বাই তো কটক যাই। এবারের ভ্রমণটা ঠিক তেমনি। বছরের শুরুতে এবছরের সম্ভাব্য অভিযানের একটা তালিকা বানিয়েছিলাম। তখনও ভাবিনি জানুয়ারি মাসে কোথাও যেতে পারব। কিন্তু ২৩ থেকে ২৬ তারিখটা খুব লোভ দেখাচ্ছিল। পাহাড় তো সবসময়ই টানে কিন্তু পকেট উল্টোদিকে টেনে আমার মনের ভারসাম্য বজায় রাখে। টানা অনেকদিন পড়াতে পড়াতে একঘেয়েমি চলে আসছিল দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম কম খরচে একটা অ্যাডভেঞ্চারে যেতেই হবে। মা লক্ষ্মী যখন সহায় নন, এরকম ভাবেই ভাবতে হয়। আমার উত্তরবঙ্গের এক ভাই বিশ্বজিৎ সাইকেল চালাতে ভালোবাসে। পরবর্তীকালে উত্তরবঙ্গে দুচাকায় পাড়ি দিতে হলে একবার ঘুরে আসা দরকার এটা ওকে জানাতে ও বলল ওর লেপচাখার দিকটা যাওয়ার ইচ্ছা কিন্তু সঙ্গীর অভাব। ব্যাস, বক্সা – জয়ন্তী – লেপচাখা নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা ও ম্যাপ তৈরি শুরু হয়ে গেল। গুগল ম্যাপ ও গুগল আর্থ সাহায্য করেছে দূরত্ব ও উচ্চতা সম্পর্কে জানতে। আর অভিজ্ঞতা জানতে পড়ে মুখস্থ করে ফেললাম রতন লাল বিশ্বাসের বর্ণনা। এবার তিনদিনের মধ্যে কিভাবে সাজাব রুটটা এটা ভাবতে শুরু করলাম টিকিট কাটার পর। টিকিটটা কনফার্ম হওয়ার দরকার ছিল কারণ আমি পৌঁছে ট্রেক শুরু করব তাই রাতে ঘুম হওয়া জরুরি। যতদূর মনে হল একমাত্র নিউ তিনসুকিয়া এক্সপ্রেস এমন ট্রেন যাতে উঠলে পৌঁছে দিন নষ্ট হয় না। এমতাবস্থায় রোজই আমাদের প্ল্যান ১৮০° বদল হয়, কোনো ফাইনাল রুট ঠিক হল না বেরোনোর আগেও। ভাবলাম, যতটা সম্ভব কভার করব, হেঁটে না পারলে দৌড়ে মেক আপ দোব। ট্রেনে আপার টায়ার কিন্তু একা ভ্রমণে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে, তাই ঘুমাই কিভাবে। চোরের ভয় করিনা। আমার স্যাক আমার পায়ে অ্যাঙ্কার করে মানিব্যাগ আর ফোন দুটো পকেটে নিয়ে পকেটে হাত দিয়ে ঘুমাই। কিন্তু ট্রেন আলিপুরদুয়ারে রাইট টাইম রাত তিনটে আঠাশ। গভীর ঘুমের উপর বিশেষ আস্থা নেই তাই আধ ঘণ্টা অন্তর ঘড়ি দেখে দেখে ভোর হল। এদিকে ট্রেন মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা লেট। রাজাভাতখাওয়া স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে গেল। নেমে পড়লাম। ভোর সাড়ে ছটা। একটুও ঠান্ডা নেই। বাস আসতে অনেক দেরি তাই স্টেশন ও আনুষঙ্গিক চত্বরে পায়চারি করে বাসস্ট্যান্ডে এলাম। একটা অদ্ভুত অথচ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যে অপেক্ষা করছে সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল না। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। অটোওয়ালারা জোর করতে লাগল পৌঁছে দেবার জন্য। বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে বাসটা আসছে তাতে আমার বন্ধু আছে তার জন্যই অপেক্ষা করছি, পয়সা বাঁচাতে নয়। সাড়ে সাতটায় বাস আলিপুরদুয়ার ছেড়ে আটটা নাগাদ রাজাভাতখাওয়া এল। উঠে পড়লাম। বাসে বসে শুরু হল আজকের প্ল্যানিং।




|| দ্বিতীয় পর্ব ||


সরকারি বাস আলিপুরদুয়ার থেকে প্রতি বুধবার সকালে জয়ন্তী যায়। তাই বাস আজ সান্তালাবাড়ি অবধি যাবে না। বক্সা মোড় থেকে একটু এগিয়ে সেনাদের ছাউনির সামনে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। আমরা নেমে পড়লাম। একটা অটো যাচ্ছিল সেটা মিস করতে উপায় না থাকায় একটা গাড়ি ভাড়া করতে হল। সাপে বর হল। অটো সান্তালাবাড়ি নামিয়ে দিলে আমাদের গাইড এসোসিয়েশন থেকে প্রথা মেনে গাইড নিতেই হত। অনেক অনুরোধের পর আমাদের গাড়ি ওই পয়েন্ট পার করে জিরো পয়েন্ট অবধি পৌঁছে দিল। শুরু হল আমাদের ট্রেক সকাল ন’টা নাগাদ। প্রায় সমতল সান্তালাবাড়ি থেকে পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে সমানে উঠে চলা। প্রায় প্রতিটি বাঁকে একবার করে ডিমা আর কালজানি নদী সহ ডুয়ার্সের দর্শন মন ভালো করে দেয়। একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চল্লাম। মাত্র সাড়ে তিন কিমি দূরত্ব দেখতে দেখতে অতিক্রম করে বক্সা ফোর্ট পৌঁছে গেলাম। ব্যাগ নামিয়ে রেখে ফোর্টের আনাচেকানাচে ঘুরে এলাম। পার্কের দোলনায় দোল খাওয়াটাও বাদ দিইনি। ঐতিহাসিক এই ফোর্ট এবং নবনির্মিত ওয়ার মেমোরিয়াল দর্শন করে পুনরায় যাত্রা শুরু। গন্তব্য তাশিগাঁও। সাড়ে চার কিমি ভালোরকমের চড়াই ভেঙে এগারোটার একটু আগে উঠে এলাম ৩১২৪ ফুট উচ্চতার এই গ্রামে। ভয় করছিল একটাই যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তোমাদের গাইড কই কি বলব। কিন্তু এক্ষেত্রে ভাগ্য সহায়। এমন এক বাড়ি গিয়ে উঠলাম, যে কাকু ভুটানি হলেও পরিস্কার বাংলা বললেন এবং আমাদের অবস্থা ও উদ্দেশ্য বুঝলেন। আমরা যে পাহাড়ের মানুষদের সাথে ব্যবসা নয় আত্মীয়তা করতে এসেছি তা উনি বুঝলেন। আমাদের রাতে টেন্ট পিচ করার অনুমতি পেয়ে গেলাম ওনার বাড়িতে, যদিও ওই অঞ্চলে বর্তমানে কোথাও টেন্ট খাটিয়ে থাকার নিয়ম নেই। হোম স্টে গজিয়ে তোলা হয়েছে ব্যবসার জন্য। যাই হোক তাশিগাঁও এসে বুঝলাম পাহাড়ের শান্তি এখানে বিঘ্নিত হয় নি। আপাতত কাকুর সাথে আলাপ চলছে আর কিছুক্ষণের বিরতি।



|| তৃতীয় পর্ব ||



তাশিগাঁও এ আমাদের ভারী স্যাক দুটো রাখলাম। আমার ন্যাপস্যাক বের করে তাতে শুকনো খাবার, জলের বোতল ভরে নিলাম। ওয়েস্ট পাউচে হেডটর্চ, লজেন্স, মেডিসিন নিয়ে নিলাম। কাকু জিজ্ঞেস করলেন, আমরা রোভার্স পয়েন্ট আর রূপম ভ্যালির রাস্তা জানি কিনা। বললাম, ম্যাপ দেখেছি, যা শুনেছি রাস্তা একটাই চওড়া, পারব আমরা, তুমি শুধু বল গেলে সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারব কিনা। কাকু আশ্বাস দিলেন আর দেরি না করে বেরিয়ে যেতে বললেন। ফুবা কাকুর বাড়ির লাগোয়া গুম্ফার গা দিয়ে রাস্তা একেবারে উপরের দিকে উঠে গেছে। আমরা উঠতে লাগলাম। এই খাঁড়াই ওঠা কিন্তু গৈরিবাস থেকে কালিপোখরি ওঠার থেকেও বেশি কষ্টকর। এক ঘন্টা অল্প রেস্ট নিতে নিতে রোভার্স পয়েন্ট চলে এলাম প্রায়। শেষ বাঁকের মুখে চারজনের সাথে দেখা। ওরা নামছে রোভার্স পয়েন্ট থেকে। দুজন ট্রেকার তার মধ্যে একজন আমাদের হাওড়ার শিবপুরের বাসিন্দা, আর দুজন ওদের পার্সোনাল গাইড। প্রথম প্রশ্ন এল প্রত্যাশিতভাবেই তোমাদের গাইড নেই কেন? অগত্যা বললাম আমরা রাস্তা চিনি। আমরা আজ রূপম উপত্যকা যাব শুনে ওরা আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, না পারবে না, যত জোরেই হাটতে থাকো সময় পাবে না দিনের আলোয় ফেরার। আমরা, দেখা যাক, টর্চ তো আছেই বলে এগিয়ে গেলাম। বারোটার সময় রোভার্স পয়েন্ট পৌঁছে পাঁচ মিনিট বিরতি নিয়ে এগিয়ে চলেছি আবার। এইবার রাস্তা রিজের উপর দিয়ে। কিছুটা যেতে বুঝলাম রোভার্স টপের দিকে না গিয়ে রাস্তাটা ওর গা দিয়ে নেমে গিয়ে আবার পাশের পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার গায়ে নতুন নীল সাদা রং আপনি পশ্চিমবঙ্গে আছেন সেটা মনে করিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। আরো আধ ঘন্টা পর আমরা খাওয়ার জন্য ছোটো বিরতি নিলাম পথের উপর বসেই। ছাতু, চিড়ে আর গুড় জলে মিশিয়ে দুজনে এক কাপ করে খেয়ে নিয়ে আবার দৌড় শুরু। হ্যাঁ, আসলে আমরা ওই লোকগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে মরিয়া। সন্ধ্যার আগে ফিরব এই টার্গেট নিয়ে দৌড়ে চলেছি। চড়াই উতরাই আর পরোয়া করছি না। সিঞ্চুলা আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। আমরা ক্রমশ ভূটান বর্ডারের দিকে এগোচ্ছি গুগল ম্যাপ তাই বলছে। মুশকিল হল এখানে কোথাও কোনো লিখিত পথনির্দেশ নেই, কোনো নামও লেখা নেই। তাই ম্যাপে লোকেশান দেখে নিতে হচ্ছিল। অদূরেই একটা জলের ব্যবস্থা পেলাম। একটা পাইপের জয়েন্ট থেকে জল চুঁয়ে পড়ছে। এটাই সম্ভবত শেষ পানীয় জলের উৎস। দুটো বোতল কানায় কানায় ভরে আবার যাত্রা শুরু। প্রায় দুঘন্টা টানা চড়াই উঠলাম। রোভার্স টপ এখন নীচু লাগছে দূর থেকে। সিঞ্চুলার মাথায় চলে এসেছি মনে হচ্ছে। তাই ভিডিও করছি আর আনন্দ করে বলছি, হুররে আর একটু পরই আমরা রূপম উপত্যকা পৌঁছে যাব। এমন সময় এক স্থানীয় মানুষের দেখা পেলাম। উনি ভূটান থেকে আসছেন। পিঠে ব্যাগ ভর্তি কমলালেবু। উনি ওনার বাড়ি লেপচাখা ফিরছেন এখন। রূপম ভ্যালি কতদূর জিজ্ঞেস করতে বললেন তোমরা ভুল পথে এসেছ। অমচুপানি থেকে জঙ্গলে ঢুকবার সর্টকাট ছিল। তবে ওটা দিয়ে যেতে পারতে না। রাস্তা নেই, গাছ সরিয়ে রাস্তা বানিয়ে যেতে হত। আমরা হতাশ হলাম। উনি বললেন আরেকটু এগিয়ে ভূটান বর্ডারটা দেখে ফিরে আসতে। কারণ ওদিক দিয়ে ঘুরে ভ্যালি যাওয়া গেলেও তা অনেক দূর হবে। ওনার কথামত ভারী মন নিয়ে বর্ডার পৌঁছে গেলাম দশ মিনিট পর। ঘড়িতে বাজে দেড় টা। এবার কি হবে? ফিরে যাব?

|| চতুর্থ পর্ব ||


ভূটান বর্ডারে এসে ম্যাপ দেখলাম। কিন্তু মুশকিল হল রূপম ভ্যালির কথা গুগল ম্যাপে উল্লেখ করা নেই। তাই কোনদিকে কতটা গেলে হবে বোঝার উপায় নেই। এমন সময় দেখি একজন ক্যামোফ্লেজ জামা পরিহিত ব্যাক্তি ওদিক থেকে ইন্ডিয়ার দিকে আসছেন। জিজ্ঞেস করতে বললেন, উনি ভূটানের নাগরিক। একটি কাজে আজ চুনাভাটি যাচ্ছেন কাল ফিরবেন। আমরা রূপম ভ্যালি কতদূর জিজ্ঞেস করতে বললেন, এইতো দুই কিমির মধ্যেই। তোমাদের এইখান দিয়ে নেমে ভূটানের চওড়া পাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে হবে। কিন্তু আজ ফিরতে পারবেনা তাশিগাঁও। আমরা হাল ছাড়িনি। বর্ডার পেরিয়ে খাঁড়া পাহাড়ের উতরাই নেমে এলাম একদম ভূটানের ন্যাশনাল হাইওয়েতে। ফাঁকা রাস্তা, দোকানপাট ও নেই, একদিকে খাঁড়া সবুজ পাহাড় অন্যদিকে উপত্যকা। চলতে শুরু করলাম, তবে ঘড়িও থেমে নেই। দুটো বেজে গেল কিন্তু রূপম ভ্যালির কথা জিজ্ঞেস করব তার জন্য একটা লোকও দেখতে পাচ্ছি না। দুটো পনেরো নাগাদ একজন কাঠুরিয়াকে রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখে বিশ্ব জিজ্ঞেস করল। উত্তরে জানলাম যেদিকে হাঁটছি সেদিকে, কিন্তু জায়গাটা জানেন না। আমরা এগোতে থাকলাম, কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আড়াইটে আমাদের ডেডলাইন, তাতে পৌঁছে গেলে ভালো নাহলে ফিরতি পথ ধরব। অদৃষ্টের এমনই লীলা, ঠিক দুটো ঊনত্রিশ মিনিটে কল্পনাতীত সুন্দর রূপম উপত্যকার দেখা মিলল একটা পাহাড়ের বাঁক ঘুরতেই। হাইওয়েতে একটা দোকানের পাশ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম ভ্যালিতে। দেখলাম দুদিকে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে দক্ষিণমুখী ওয়াং চু চলেছে চপলা অষ্টাদশী যুবতীর মতো। পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে মধ্যগতিতে যার নাম হয়েছে রায়ডাক। উপত্যকার মানুষের জীবিকা মূলত চাষবাস। পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে ঝুমচাষ দেখতে পেলাম। গ্রামের মানুষজন ভীষণ ভালো আর মিশুকে। দু মিনিটে আমাদের বড্ড আপন করে নিলেন তারা। এখন তাশিগাঁও ফিরে যাব শুনে অবাক হলেন তারা। আমরা মাত্র পনেরো মিনিট সময় অতিবাহিত করেই বিদায় নিয়ে ফিরতে লাগলাম একই পথে। ভূটানে ঢোকার পর থেকেই খুব ঠান্ডা লাগছিল, আসলে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ; একদমই রোদ না পড়ায় হাওয়া ভীষণ ঠান্ডা। ফেরার সময় আমরা কোথা দিয়ে নেমেছিলাম রাস্তায় সেটা খুব সহজে খুঁজে পেতাম না কারণ সব জায়গাই একরকম দেখতে। আগাম ভেবেই আমরা আমাদের হাতের লাঠি দুটো রাস্তার ধারে রেখে গিয়েছিলাম। তিনটে পনেরো নাগাদ আবার পৌঁছে গেলাম বর্ডারে। এবার শুরু হল প্রাণপণ দৌড়। হাতে দুঘন্টার ও কম সময় আর পেরোতে হবে তেরো কিমি পথ।






|| পঞ্চম পর্ব ||


জীবনে কখনও দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হইনি। নিজের সীমাবদ্ধতা নিজে জানি। তবু আজ দৌড়েই ফিরতে হবে। বিশ্বজিৎ আমার আগে আগে চলেছে। ছিপছিপে খেলোয়াড়সুলভ চেহারার বিশ্বজিতের সাথে এই রাতদিন ছাত্রপড়ানো স্নেহপদার্থসঞ্চিত উদর নিয়ে পেরে উঠব না এটাই স্বাভাবিক। ওকে দেখে ক্ষিপ্র হরিণ মনে হচ্ছে। প্রথম কয়েক মিনিট রাস্তা হাল্কা চড়াই আর উতরাই মেশানো ছিল। তবে তারপর এল প্রচন্ড এক উতরাই। আমরা দুজনের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলাম, কারণ ও হঠাৎ থেমে গেলে ওর ঘাড়ে গিয়ে পড়তে পারি। একদিকে সুগভীর খাদ, অন্যদিকে খাড়া দেওয়াল। পাকদন্ডী বেয়ে দৌড়ে নেমে আসা খুব সহজ ছিল না। চড়াই উঠতে শরীর হাঁপিয়ে ওঠে কিন্তু পা হাঁপায় না, উতরাই নামতে গেলে শরীর ক্লান্ত হয় না তবে হাঁটু দুটো বড্ড ব্যাথা পায়, আর সেই ব্যাথা ক্রমে সঞ্চারিত হয় উরুর পেশিতে। পেশিক্লান্তির ভয় থাকে। এজন্য একবার বিরতি নিলাম একঘন্টা টানা নেমে আসার পর। এখনও রোভার্স পয়েন্ট বেশ দূর। জলের একটা পাইপ লাইনের কথা আগেই উল্লেখ করেছি যেখান থেকে শেষবার জল ভরেছিলাম। এখন সেখানেই জল ভরতে ভরতে বিরতি নিচ্ছি। জল খেয়ে বোতল হালকা করে আবার দৌড় শুরু। এবার গতিবেগ বাড়ল, দেখলাম পা দুটো একটু মানিয়ে নিতে পেরেছে। পনেরো মিনিট রুদ্ধশ্বাস দৌড়ের পর চারটে চল্লিশ নাগাদ রোভার্স পয়েন্ট পৌঁছে গেলাম। বিশ্ব একটু আগে পৌঁছে বিশাল খাদের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ফটো সেশান শুরু শুধু আমার ফোন বের করার অপেক্ষা। নানারকম পোজে ফটো তোলার পর আমরা ঠিক করলাম একটু সূর্যাস্তটা দেখেই না হয় গোধূলির পড়ন্ত আলোয় বাকিটা ফিরব। অ্যাকশন ক্যামটা টাইমল্যাপ্সে বসিয়ে দিয়ে আমরা একটু এদিক ওদিক জঙ্গলে উঁকি দিয়ে এলাম। তারপর শুরু হল ফাইনাল ডিসেন্ড। হুড়মুড়িয়ে কুড়ি পঁচিশ মিনিটে নেমে এলাম তাশিগাঁও। ফুবা কাকু আমাদের পথ চেয়ে বসেছিলেন। আমরা ফিরতে প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা পৌঁছাতে পেরেছিলাম কিনা। ওনাকে ছবি দেখালাম। বললেন, তোমরা পাহাড়ের মানুষদের থেকেও দ্রুত দেখছি। কাল পামসে যাওয়ার গাইড বলে রেখেছি। সকাল সকাল বেরিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি ফিরে যাবে। আমরা আশ্বস্ত হলাম। পা দুটো এবার বিশ্রাম পাক আপাতত।





|| ষষ্ঠ পর্ব ||


সন্ধ্যা হব হব করছে, আমরা ফিরে হাতমুখ ধুয়ে আমাদের টু মেন টেন্টটা কাকুর বাড়ির উঠোনে পিচ করে ফেললাম। টেন্ট না আনলেও কাকুর ঘরে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যেত। কিন্তু বিছানায় তো বাড়িতে শুই, এখানে একটু অন্যরকম স্বাদ নিই। কোনো জায়গা সম্পর্কে জানতে হলে শুধু বই পড়ে হয় না, সেখানকার বাসিন্দাদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা খুব জরুরী। দিনের শেষে তাই ফুবা কাকুর সাথে আড্ডা মারতে বসলাম। পেটে আগুন জ্বলছে। কাকু আগের দিনের পূজোর প্রসাদ খেতে দিলেন। বৌদ্ধদের এই পূজোর প্রসাদ আমার ভীষণ পছন্দ হল। বাড়িতে তো কৌটো থেকে দুটোর বেশি তিনটে বিস্কুট খেলে মা বকে, এখানে দুজনকে এক ডেচকি বিস্কুট সহযোগে চা দেওয়া হয়েছে। অনেক রকমের বিস্কুট। আমরা প্রতিটা একটা করে টেস্ট করে নিলাম। বিশ্বজিতের ভাষা শেখার সহজাত আগ্রহ আছে, ও অনেক শব্দ গল্পের মাঝে ভূটানি ভাষায় শিখে নিল। আমরা যে পথে আজ অ্যাডভেঞ্চার করে ফিরলাম ওই পথে দলাই লামা এসেছিলেন ভূটান দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে। চীন সরকারের হাত থেকে পালিয়ে তিন সহস্রাধিক শরণার্থীদের নিয়ে বক্সা ফোর্টে ছিলেন। ভূটানের রাজার বাড়ি ছিল আলিপুরদুয়ারে, রাজা এই পথ দিয়েই সিঞ্চুলা হয়ে ভূটানে যেতেন। একসময় ভূটানের সাধারণ মানুষ কেনাবেচা করতে বক্সা সদর বাজারে এই পথেই আসত। তবে কেন এই জনপ্রিয় পথ বর্তমানে এতটা অনাদৃত? মূলত এই সমগ্র অঞ্চল বক্সা ব্যাঘ্র সংরক্ষণকেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত, তাই বন্যপ্রাণীদের স্বার্থে পাকা রাস্তা তৈরি হয়নি, এছাড়া জয়গাঁও – ফুন্টশেলিং পাকা চওড়া রাস্তা হয়ে গিয়ে ওইদিক দিয়েই পশ্চিমবঙ্গ ও ভূটানের পরিবহণের সমন্বয় ঘটেছে। তাই আর এদিক দিয়ে গুটিকয়েক স্থানীয় মানুষ ছাড়া আর কারোর পা পড়ে না। আর আমাদের মতো কিছু অ্যাডভেঞ্চার পাগল মানুষ এখানে আসেন প্রকৃতির আদি অকৃত্রিম রূপ উপলব্ধি করতে। ইতিহাস শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গেলাম। সময়টা যখন কয়েক দশক পিছিয়ে গিয়েছে, ঠিক তখনই এল রাতের খাবার। জীবনে প্রথমবার সন্ধ্যা সাতটায় ডিনার করলাম। ডাল, সবজি সহযোগে ডিম, ভাত। আমাদের কোনো চাহিদা ছিল না। কাকু আমাদের জন্য চিকেন আনাবে কিনা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমরা বললাম, আমরা তো তোমার ঘরের ছেলের মতো, যা তোমরা খাবে আমরা তাই খাব। কাকুর চার ছেলে দুই মেয়ে। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, আরেকজন বিশ্বর বয়সী, আলিপুরদুয়ারে কলেজে পড়ে। আর ছেলেরা সকলেই বাইরে থাকে, কেউ ভূটানে, কেউ সিকিমে। কাকুর বেশ বয়স হয়েছে, তবে কখনও পৈতৃক ভিটে ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবেন নি। খাওয়ার শেষে বেরিয়ে এসে দেখি সেই আকাশ। কালপুরুষসহ বেশ কিছু নক্ষত্রমণ্ডল স্পষ্ট দেখলাম। এই নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখতে মাসে মাসে পাহাড়ে ছুটে আসি। তবে লেপচাখা পাহাড়ের একদম মাথায়, তাই ওখান থেকে আরও ভালোভাবে আকাশ দেখা যায়। তাঁবুতে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে আমাদের গোটাদিনের প্রাপ্তি একবার তর্জমা করে নিলাম মনে মনে। সারাদিনের পরিশ্রম আর কালকের ট্রেনের বিনিদ্র রাত খুব শীঘ্রই ঘুম এনে দিল।




 

দ্বিতীয় অধ্যায়:


 

Writer and Explorer: Soumik Maiti

He is a private tutor by Profession and his aim in life is to explore the world.

Original blog: Click here => Bong explorer

Facebook page: https://www.facebook.com/bongxplorer/


101 views0 comments